স্মরণ...

মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিম্বর আলী তালুকদার। ১৯২০ সালে হবিগঞ্জ জেলার সদর থানার ভাদৈ গ্রামে নিম্বর আলী তালুকদার জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪০ সালে হবিগঞ্জ শহরের জেকে এন্ড এইচ কে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন। ১৯৪৩ সালে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন। আইএ পাশ করার পরই পড়াশুনা থেকে ইতি টানেন এবং রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে একজন কর্মী হিসেবে রাজনীতি শুরু করেন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে সমাজসেবক হয়ে উঠেন। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে সকল আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে হবিগঞ্জ সদর-লাখাই-মাধবপুর আসনে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে অ্যাডভোকেট মোস্তফা আলীর সমর্থনে এবং আওয়ামী লীগের বিজয়ের জন্য প্রচুর কাজ করেন। নিম্বর আলী তালুকদার রাজনীতিতে অ্যাডভোকেট মোস্তফা আলী এমপির একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের তাঁর ছিল অসামান্য অবদান। ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। যুদ্ধ করেছেন ৩নং সেক্টরের অধীনে।
১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ের জন্য ব্যাপক কাজ করে প্রশংসিত হন। বঙ্গবন্ধুর সাথে নিম্বর আলী তালুকদারের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবসময় নিম্বর আলী তালুকদারকে নাম ধরেই ডাকতেন।
নিম্বর আলী তালুকদার সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন। সব সময় মুজিব কোট পরতেন। তিনি রুচিশীল পোশাক পরিধান করতেন। রুচিশীল পোশাকের জন্য জাতীয় নেতারা তাকে পছন্দ করতেন।
১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে প্রথম হবিগঞ্জ মহকুমা রেড ক্রস সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক পদে নিয়োগ পান তিনি। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) গঠিত হলে নিম্বর আলী তালুকদার হবিগঞ্জ মহকুমার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হবার পর নিম্বর আলী তালুকদার আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।
হবিগঞ্জ জেলা কৃষকলীগের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন নিম্বর আলী তালুকদার। হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের রাস্তাঘাটে বলতেন, আওয়ামী লীগ কি ক্ষমতায় যেতে পারবে? যারা বলতেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাবে, তাদেরকে তিনি চকলেট খেতে দিতেন।
একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সব সময় জনকল্যাণমূলক কাজ করতেন। তিনি একজন খাটি দেশপ্রেমিক এবং একজন অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তি ছিলেন। ছিলেন একজন শিক্ষানুরাগী। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার কাজে অনেক আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অত্যন্ত স্নেহধন্য নিম্বর আলী তালুকদার ১৯৯৫ সালের ২১ আগস্ট ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যুর আগে তিনি আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছে দুঃখ করে বলতেন, আমি বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার দেখে যেতে পারবো না। শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীও দেখে যেতে পারবো না।
নিম্বর আলী তালুকদার শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার না দেখেই ‘একটা দুঃখ’ নিয়ে মারা গেলেন। একজন সৎ ও একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিবিদ হবিগঞ্জের মাটি থেকে চলে গেলেন। তিন পুত্র, এক কন্যা রেখে গেছেন তিনি। নিম্বর আলী তালুকদারের ছেলে আব্দুর রশীদ তালুকদার ইকবাল নবগঠিত শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তার অপর ছেলে আব্দুল আউয়াল তালুকদার হবিগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত।