স্টাফ রিপোর্টার ॥ প্রায় ১৯ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মারা গেলেন ভবঘুরে জীবন মিয়া (৪৫)। গতকাল শনিবার সকাল ৬টার দিকে তিনি হবিগঞ্জ আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। জীবন মিয়ার অভিভাবক হিসেবে হবিগঞ্জ চৌধুরী বাজার ফাঁড়ি থানার এএসআই রানা মিয়া মৃতদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেন।
প্রসঙ্গত, গত ৩০ মার্চ দৈনিক হবিগঞ্জের মুখ পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে ‘চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে ভবঘুরে জীবন মিয়া’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সংবাদটি নজরে আসে চৌধুরী বাজার পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই রানা মিয়ার। তিনি বিষয়টি হবিগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ মাসুক আলীকে জানান। তখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাসুক আলী এএসআই রানা মিয়াকে জীবন মিয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। এমতাবস্থায় এএসআই রানা মিয়া হবিগঞ্জ চৌধুরী বাজারস্থ নূরুল হেরা মসজিদের পাশে অবস্থানরত মানসিক প্রতিবন্ধী জীবন মিয়াকে খোঁজে বের করেন এবং তাকে হাসপাতালে নেয়ার ব্যাপারে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতা কামনা করেন। কিন্তু করোনাভাইরাস আক্রান্ত ভেবে অনেকেই জীবন মিয়ার কাছে যেতে রাজি হননি। কোন প্রস্তুতি না থাকায় এএসআই রানা মিয়া সেখান থেকে ফাঁড়িতে ফিরে যান এবং সেখান থেকে তিনজন সুইপার নিয়ে পুনরায় ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু জীবন মিয়ার অবস্থা ও পারিপাশির্^ক পরিবেশ পরিস্থিতি এতটাই নোংরা ছিল যে দুইজন সুইপার সেখান থেকে পালিয়ে যায়। পরে এএসআই রানা মিয়ার অনুরোধে একজন সুইপার জীবন মিয়াকে সেখান থেকে উঠিয়ে নিয়ে আসে এবং একটি পিকআপ ভ্যানে করে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। যদিও হাসপাতালে ভর্তি প্রক্রিয়াটা খুব একটা সহজ ছিল না। হাসপাতালের ইমার্জি বিভাগে দায়িত্বরত কেউই জীবন মিয়াকে হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারে এগিয়ে আসেননি। জীবন মিয়া মানসিক প্রতিবন্ধী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি করতে চাইলে তারা তাকে করোনা আক্রান্ত বলে দাবি করেন। শেষে এএসআই রানা মিয়া বাধ্য হয়ে হাসপাতালের আরএমও-কে ফোন করে বিষয়টি অবগত করলে আরএমও হাসপাতালে দায়িত্বরতদের জীবন মিয়াকে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করার নির্দেশ দেন। তখন তারা জীবন মিয়াকে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি করেন।
দৈনিক হবিগঞ্জের মুখ পত্রিকার প্রতিবেদক খবর পেয়ে সাথে সাথে হাসপাতালে যান জীবন মিয়াকে দেখতে। হাসপাতালে জীবন মিয়ার চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেন। পাশাপাশি চৌধুরী বাজার পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে এএসআই রানা মিয়া ও এএসআই কালামের সাথে দেখা করেন এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
এদিকে তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মোঃ সাগর আহমেদ শামীম আয়ারল্যান্ড থেকে মোবাইল ফোনে মানসিক প্রতিবন্ধী জীবন মিয়ার খোঁজ নেন এবং হাসপাতালে ভর্তি বিষয়টি জানতে পেরে তিনি এএসআই রানা মিয়া ও এএসআই কালামকে ধন্যবাদ জানান এবং তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। শামীম আহমেদ বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সারাদেশ লকডাউন হয়ে যাওয়ায় এমন হাজারো জীবন মিয়া অলিতে গলিতে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সরকারের দায়িত্বশীলসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজ নিজ জায়গায় থেকে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে আহবান জানিয়েছেন তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আয়ারল্যান্ড প্রবাসী মোঃ সাগর আহমেদ শামীম। যতদিন লকডাউন চলবে ততদিন যেন স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের এলাকার মানসিক প্রতিবন্ধীদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখেন।
উল্লেখ্য, দৈনিক হবিগঞ্জের মুখ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম গত ৩০ মার্চ মানসিক প্রতিবন্ধী জীবন মিয়ার খোঁজে চৌধুরী বাজার খোয়াই মুখ এলাকায় যান। সেখানকার বাসিন্দা ফারহান মিয়ার সাথে প্রথমেই পরিচিত হয়ে তার কাছ থেকে জানতে পারেন প্রায় ৪ মাস পূর্বে লোকটা এখানে এসে আশ্রয় নেয়। তখন সুস্থ স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছিল। কোন কিছু খাবে কি-না জিজ্ঞেস করলেই বলত বিড়ি খাবো। বিড়িই তার প্রধান খাবার। বেশির ভাগ সময় বিড়ি খেতেই দেখেছেন ফারহান মিয়াসহ স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ভবঘুরে অবস্থায় লোকটাকে তারা নিয়মিতই খোয়াই নদীর পাড়ে পৌরসভার ফেলা ময়লা আবর্জনা থেকে উচ্ছিষ্ট কুড়িয়ে এনে খেতে দেখতেন। এক পর্যায়ে লোকটাকে দুর্বল হয়ে পড়তে দেখে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ফারহান মিয়াদের বিল্ডিংয়ের নিচতলায় পুরনো কাপড় দিয়ে থাকার জায়গা করে দেন। সেই থেকে একই স্থানে প্রায় চার মাস যাবত অবস্থান করছে লোকটা। কেউ কোন প্রশ্ন করলে জবাব দেয় না সে। তখন আশপাশের ব্যবসায়ীসহ স্থানীয় বাসিন্দারা মাঝে মধ্যে তাকে খাবার দিতেন। কিন্তু কথা না বলায় কেউ বুঝতেন না তার অনুভুতি। ফলে অনেক সময় পানির পিপাসা হলে সে প্র¯্রাব করে তা-ই খেয়ে ফেলত। দীর্ঘদিন অর্ধাহারে অনাহারে থাকতে থাকতে সে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে এখন উঠে দাঁড়াতেও পারছে না। এমতাবস্থায় লোকটির পাশে এসে দাঁড়ায় তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশন। প্রতিদিন নিয়মিত লোকটির কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশনের সদস্য স্কুলছাত্র সানি। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে সারাদেশ লকডাউন হয়ে যাওয়ায় ৪/৫ দিন ধরে ফাউন্ডেশন থেকে খাবার পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফারহান মিয়া প্রায়ই লোকটিকে ভাতসহ বিভিন্ন খাবার পরিবেশন করে আসছেন। শারীরিক দুর্বলতার কারণে লোকটি খাবারও ঠিকমত খেতে পারছে না। ফলে ক্রমশই সে আরো দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গত ২৮ মার্চ রাতে তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আয়ারল্যান্ড প্রবাসী মোঃ সাগর আহমেদ শামীম মোবাইলে ফোন করে এই প্রতিনিধিকে লোকটার খোঁজ নিতে বলেন। মূলত শামীম আহমেদের কথায়ই প্রতিবেদক লোকটার খোঁজে পরদিন দুপুরে বের হন এবং সেখানে গিয়ে প্রথমেই ফারহান মিয়ার সাথে প্রতিবেদকের দেখা হয়। তিনিই লোকটার কাছে নিয়ে যান। হবিগঞ্জ চৌধুরী বাজারস্থ নূরুল হেরা মসজিদের পাশে ছোট্ট একটা গলির ভিতর দিয়ে গিয়ে দেখতে পান ফারহান মিয়াদের বিল্ডিংয়ের নিচতলা জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে লোকটা। লোকটাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। ফারহান মিয়াকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারেন লোকটা পানীয় জাতীয় খাবার বেশি খায়। তাই পাশর্^বর্তী দোকান থেকে একটা ম্যাংগু জুস আর সাথে কিছু ড্রাই কেক কিনে দেন। কিন্তু লোকটার আশপাশের অবস্থায় এতটাই নোংরা ছিল যে কোনভাবেই লোকটার কাছে যাওয়া যাচ্ছিল না। তখন লোকটাই বলে উঠল ‘আমার পাশে উড়াইয়া মার না কেনে’। শেষে লোকটার কথামত জুসের বোতল আর ড্রাই কেকের প্যাকেট ছুড়ে দেন।
উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বর মাসে তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আয়ারল্যান্ড প্রবাসী মোঃ সাগর আহমেদ শামীম সীমিত সময়ের জন্য দেশে এসেছিলেন। তখন তিনি নিজেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে মানসিক প্রতিবন্ধীদের খুঁজে বের করে তাদের চিকিৎসা এবং খাবারের ব্যবস্থা করে দেন। দেশে থাকাকালীন সময়ে তিনি নিজেই প্রতিবন্ধীদের কাছে খাবার পৌঁছে দিতেন। করোনাভাইরাসের কারণে সারাদেশ লকডাউন হয়ে যাওয়ায় এমন হাজারো জীবন মিয়া অলিতে গলিতে অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও সরকারের দায়িত্বশীলসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের নিজ নিজ জায়গায় থেকে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করতে আহবান জানিয়েছেন তাসনুভা শামীম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আয়ারল্যান্ড প্রবাসী মোঃ সাগর আহমেদ শামীম। যতদিন লকডাউন চলবে ততদিন যেন স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের এলাকার মানসিক প্রতিবন্ধীদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখেন।