জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি ॥ প্রধান উপদেষ্টা
হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের নানা কর্মসূচি
স্টাফ রিপোর্টার ॥ মহান বিজয় দিবস আজ। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি শাসন-শোষণ থেকে মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল জাতি। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর দ্বিতীয়বারের মতো উদ্ যাপন হতে যাচ্ছে মহান বিজয় দিবস। জুলাই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে হাজারো মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছেন। আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন কয়েক হাজার মানুষ।
বিজয়ের এই দিবসে মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। ৫ই আগস্টের পর বৈষম্যমুক্ত নতুন এক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে একগুচ্ছ সংস্কার পরিকল্পনা দিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। একইসঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। এবার অনেকটা নির্বাচনী আবহেই উদযাপন হবে বিজয় দিবস।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার মুহূর্তকে স্মরণ করে বিজয় দিবস উদ্ যাপন শুরু হবে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে।
দিবসটি উপলক্ষে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং মিশনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হবে।
বিজয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের সকল জেলা ও উপজেলায় ৩ দিনব্যাপী বিজয় মেলার আয়োজন করেছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন শিশুদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের ওপর আবৃত্তি, প্রবন্ধ রচনা এবং চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং দিবসটি উদ্ যাপনের জন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।
সকাল ৯টায় বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন এবং কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করবে।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার চিরশান্তি, আহত প্রবীণদের সুস্থতা এবং দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা করা হবে।
এ ছাড়াও দেশের সকল হাসপাতাল, কারাগার, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা, পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র, শিশু পরিবার এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এক বাণীতে দেশবাসীকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এবারের বিজয় দিবস হোক জাতীয় জীবনে নতুনভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দিন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়া ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে যে নবযাত্রা সূচিত হয়েছে, তা যেকোনো মূল্যে রক্ষার শপথ নেওয়ার দিন।’ প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আমাদের মহান বিজয় দিবস। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। ১৯৭১ সালে ৯ মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে এই দিনে আমরা পাই কাক্সিক্ষত বিজয়ের স্বাদ। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাই একটি স্বাধীন জাতিসত্তা, আর এই লাল-সবুজের পতাকা।’ তিনি এই দিনে দেশে ও বিশ্বজুড়ে বসবাসরত সব বাংলাদেশিকে বিজয়ের উষ্ণ শুভেচ্ছা জানান।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মহান মুক্তিযুদ্ধসহ স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, সেসব বীর শহীদকে। তাদের এই আত্মদান আমাদের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা ও সাহস জোগায়, সব সংকটে-সংগ্রামে দেখায় মুক্তির পথ।’
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল, বিগত বছরগুলোতে তা বারবার স্বৈরাচার আর অপশাসনে ম্লান হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতি ও স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সুর্যোদয়ের সাথে সাথে সকল সরকারি, আধা সরকারি, সায়ত্বশাসিত এবং বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, দুর্জয় হবিগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা নামফলক, মুক্তিযুদ্ধের সেকেন্ড ইন কমান্ড মরহুম মেজর জেনারেল আব্দুর রব বীরউত্তম, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম এর কবরে পুষ্পস্তবক অর্পন ও ফাতেহা পাঠ, সেক্টর কমান্ডার মরহুম সিআর দত্ত স্মরণে কালীবাড়ি মন্দিরে প্রার্থনা সভা, সকাল ৯টায় হবিগঞ্জ জালাল স্টেডিয়ামে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশনা, কুচকাওয়াজ ও ডিসপ্লে প্রদর্শন, সকাল ১১টায় জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে বীরমুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা ও আলোচনা সভা, সকাল ১১টা হতে বিকেল ৫টা পর্যন্ত গোপায়া ইউনিয়নের রাঙেরগাঁও ফ্রিডম ওয়ার্ল্ড পার্কে স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের বিনা টিকেটে দর্শনের সুযোগ, সুবিধাজনক সময়ে সিনেমা হল সমূহে বিনা টিকেটে ছাত্রছাত্রীদের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং উন্মুক্ত স্থানে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, হাসপাতাল, জেলখানা, এতিমখানা ও শিশু পরিবারসমূহে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন, বাদ জোহর ও সুবিধাজনক সময়ে জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে এবং মুক্তিযুদ্ধের শহীদ/আত্মদানকারী/যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মসজিদে মিলাদ মাহফিল ও বিশেষ মোনাজাত এবং মন্দির, গীর্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা।

